আনারস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
আনারস একটি ট্রপিক্যাল (গ্রীষ্মমন্ডলীয়) ফল, যা তার মিষ্টি-টক স্বাদ, সতেজ সুবাস এবং পুষ্টিগুণের জন্য বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এর উৎপত্তি হলেও বর্তমানে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আনারস চাষ করা হয়। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের মধুপুরকে আনারসের রাজধানী বলা হয়।কেননা এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের আনারস চাষ হয়। এখানকার মাটি আনারস চাষের জন্য সবথেকে ভালো। আনারসের মধ্যে অনেক ধরনের গুরত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে সেগুলো হলো ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, ফাইবার এবং ব্রোমেলিন এনজাইম।
এই উপাদানগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, খাবার পাকস্থলীতে হজমে সহায়তা করতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য বা প্রদাহ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে সাধারণত আনারস কাঁচা খাওয়া হয়, তবে আনারস কে কাঁচা খাওয়া ছাড়াও বেশ কিছু ভাবে ব্যবহার করা যায়। যেমন জুস, সালাদ, কেক, পিজ্জা বা রান্নায়ও ব্যবহার করা যায়।
আনারস খাওয়ার উপকারিতা
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
আনারস যেহেতু খেতে টক এ কারণে আনারসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। যা আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমুইন সিস্টেমকে অনেক শক্তিশালী করে তোলে। এছাড়াও আনারসে থাকা ভিটামিন সি আমাদের শরীরের কোষ কে ক্ষতিকর ফ্রি রেডিক্যাল থেকে রক্ষা করে। আমরা যদি নিয়মিত আনারস খেতে পারি তাহলে সর্দি-কাশি বা অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারি।সেইসাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে।
২. হজমে সহায়ক
আনারস হজমের জন্য বিশেষভাবে উপকারী একটি ফল। আনারসে ব্রোমেলিন নামের একটি প্রাকৃতিক এনজাইম থাকে। যা আমাদের খাবারের প্রোটিনকে ছোট ছোট অ্যামিনো এসিডে ভেঙ্গে দেয়। ফলে শরীর সহজেই তা শোষণ করতে পারে। এছাড়াও যারা ভারী খাবার অর্থাৎ মাংস বা প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর হজমের সমস্যা অনুভব করেন তাদের জন্য আনারস একটি প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়, পেটের অস্বস্তি দূর করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে। এর কারণ হলো আনারসে অদ্রবণীয় ফাইবার থাকে যা মল কে ভারী করে এবং সহজে বের করতে সাহায্য করে।
৩. প্রদাহ কমায়
উদাহরণ হল শরীরের একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ব্রোমেলিন শুধু হজমে নয়, প্রদাহ কমাতেও কার্যকর। যারা আর্থ্রাইটিস, সাইনাস ইনফেকশন বা অস্ত্রোপচারের পর ফোলা সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য আনারস উপকারী হতে পারে। এটি শরীরের ভেতরে জমে থাকা প্রদাহ কমিয়ে ব্যথা হ্রাস করে।
৪. হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা
আনারস হৃদযন্ত্রের জন্যও উপকারী কারণ এতে থাকা ব্রোমেলিন এনজাইম, ভিটামিন সি, ফাইবার ও পটাশিয়াম রক্তনালীকে সুস্থ রাখে, কোলেস্টরেল কমায় এবং রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত খেলে বা রক্ত পাতলা করার ওষুধের সঙ্গে খেলে ঝুঁকি থাকতে পারে। সুতরাং আপনি যদি রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেয়ে থাকেন সেই অবস্থায় আনারস খাওয়া থেকে বিরত থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে মাত্র ৬ দিন আনারসের জুস খেলে LDL (”খারাপ”) কোলেস্টরেল প্রায় ১৪% কমে যায়। এতে করে হৃদযন্ত্রের উপর চাপ কমে এবং ধমনীর ভেতরে চর্বি বা ফ্যাট জমা প্রতিরোধ হয়। ফলে হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।
৫. হাড় ও দাঁতের জন্য ভালো
আনারস শুধু একটি সুস্বাদু ফলই নয় বরং হাড়ের ও দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। প্রথমেই আমরা জেনে নেই আনারস কিভাবে হাড়ের জন্য ভালো। আমরা জানি আনারসে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস থাকে যা হাড়ের গঠন ও দৃঢ়তা বজায় রাখে। দ্বিতীয়ত আনারসে ম্যাগনেসিয়াম থাকে যা হাড়ে ক্যালসিয়াম জমা করতে সাহায্য করে, এর ফলে হাড় ভাঙ্গার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।তৃতীয়ত আনারসে ম্যাঙ্গানিজ থাকে যা হাড়ের টিস্যু তৈরি ও মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং নিয়মিত আনারস খেতে পারলে হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং বয়স জনিত অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে সহায়ক হয়।
এখন আমরা জানবো আনারস কিভাবে দাঁতের জন্য উপকারী। আনারসে থাকা ভিটামিন সি দাঁতের মাড়িকে শক্ত করে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। যেহেতু আনারসের প্রাকৃতিক অম্লীয়তা রয়েছে সে কারণে আনারস দাঁতের প্লাক ও ব্যাকটেরিয়া কমাতেও সাহায্য করে। সেইসাথে আনারসে থাকা ফাইবার দাঁত পরিষ্কার রাখে এবং খাবারের কনা যেন দাঁতের ফাকে না আটকে থাকে সেই দিকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আরও পড়ুন : করলার জুস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
৬. ত্বক ও চোখের স্বাস্থ্য
কোলাজেন এমন একটি প্রোটিন যা আমাদের ত্বককে টানটান, মসৃণ ও তরুণ করে রাখে। যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যেতে থাকে। ফলে ত্বকে বলিরেখা (ভাঁজ) দেখা যায়। আনারসে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে সেই ভিটামিন সি আমাদের শরীরে কোলাজের উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেয়। যার ফলে আমাদের শরীরের ত্বক টান টান ও মুসূণ থাকে। একইরকম ভাবে আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের দৃষ্টি কমে যায়। অনেক সময় দেখা যায় ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (চোখের বয়সজনিত সমস্যা) নামক এক ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। আনারসে থাকা ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখের কোষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং এই রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
গোলাপ ফুলের যেমন কাঁটা থাকে, ঠিক তেমনি ভাবে আনারসেরও কিছু অপকারিতা রয়েছে। এ পর্যায়ে আমরা আনারসের কিছু অপকারিতা দেখে নিব।
আনারস খাওয়ার অপকারিতা
১. মুখে জ্বালা বা চুলকানি
আনারস খাওয়ার পর আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাবো আমাদের মুখের হালকা জ্বালা, চুলকানি বা অস্বস্তি দেখা দিচ্ছে। এটি ঘটার মূল কারণ হলো এতে থাকা ব্রোমেলিন এনজাইম এবং প্রাকৃতিক অম্লীয়তা। এটি মুখের মধ্যে থাকা নরম টিস্যুতে প্রোটিন ভেঙে দেয় ফলে আমাদের ঠোট, জিহ্বা বা গালের ভিতরে জ্বালা অনুভব হয়। প্রাকৃতিক অম্লীয়তা থাকার কারণে মুখের সংবেদনশীল অংশে অস্বস্তি বোধ হতে পারে। যাদের আগে থেকেই মুখে ক্ষত, কাটা বা আলসার আছে তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরো তীব্র হতে পারে।
২. অ্যালার্জির ঝুঁকি
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আনারস খেলে চুলকানি, র্যাশ, পেট ব্যথা, বমি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। গুরুতর অ্যালার্জিতে শকও হতে পারে। তাই যাদের আগে থেকেই অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তাদের সতর্ক থাকতে হবে।
আরও পড়ুন: ডালিমের উপকারিতা ও অপকারিতা
৩. অতিরিক্ত খেলে হজমের সমস্যা
যদিও আনারস হজমে সহায়ক, তবে অনেক সময় অতিরিক্ত খেলে বা সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উল্টো সমস্যা হতে পারে। আনারসের অম্লীয়তা পেটের আস্তরণে চাপ সৃষ্টি করে। যার ফলে অনেক সময় ডায়রিয়া, পেট ব্যথা বা গ্যাসের সমস্যা দেখা দেয়।
৪. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সতর্কতা
আনারস প্রাকৃতিক ভাবেই একটি মিষ্টি ফল। এটি অসংখ্য পুষ্টিগুণে ভরপুর। এতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন মিনারেল ও এন্টিঅক্সিডেন্ট এর মত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর পাশাপাশি এতে প্রাকৃতিক চিনি (ফ্রুক্টোজ) এবং কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। যা রক্তে শর্করা এর মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আনারস খাওয়া একদিকে উপকারী হলেও অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ থেকেই যায়।
৫. গর্ভাবস্থায় সতর্কতা
আনারস সাধারণত পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি ফল। তবে গর্ভাবস্থায় আনারস খাওয়ার বিষয়ে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। কেননা এতে থাকা কিছু উপাদান গর্ভবতী নারীদের জন্য সর্তকতার সঙ্গে খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে দেয়। এতে থাকা ব্রোমেলিন এনজাইম জরায়ুর সংকোচন বাড়াতে পারে যা গর্ভপাত বা প্রি-ম্যাচিউর লেবারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় অনেক নারীর অ্যাসিডিটি বা বুক জ্বালা-পোড়ার সমস্যা দেখা যায়। সেক্ষেত্রে আনারস খাওয়া এই সমস্যাটি বাড়িয়ে দিতে পারে। এই গর্ভাবস্থায় আনারস সেবন এর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করায় শ্রেয়।


BD Health Net এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url